Sunday, July 3, 2016

রেখেছো মুসলিম করে- বাঙ্গালী করোনি!!!


রেখেছো মুসলিম করে- বাঙ্গালী করোনি, পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমরা কখনও কি বাঙালি হতে পারবে না? 


ভোটার হিসাবে শক্তি ৩০ শতাংশ। জনতা হিসাবে আর একটু বেশি। রাজনৈতিক গোষ্ঠী হিসাবে সহজেই পোলারাইজড করা যায়।ফলত, আনুমানিক ১০০ টা বিধানসভা কেন্দ্রের নির্মাতা তারাই। তাই প্রতি রাজনৈতিক দলের কাছে মুসলিম ভোট ব্যাংক একটা বিশাল অংকের খেলা। ২০১৬ সালের সাধারন নির্বাচন তার ব্যাতিক্রম ছিল না  । সাচার কমিটির রিপোর্ট, রঙ্গনাথ মিশ্র কমিশনের প্রতিবেদন, অমর্ত্য সেনের বিশেষ সমীক্ষা, বিভিন্ন সরকারী পরিসংখ্যানের সারকথা হল- পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানেরা পিছিয়ে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকা বাসস্থান, সংস্কৃতি সবেতেই তার প্রতিফলন। অতএব প্রতিটি নির্বাচনের আগে একদল পোস্য মুসলিম বুদ্ধিজীবি আর নেতাদের আবির্ভাব হয়। তারাই ঠিক করে দেন এই দুর্দশার দায় কাদের- এই সরকার নাকি আগের সরকার। তারাই বাতলে দেয় কাকে ভোট দেওয়া উচিত- কাকে নয়।
 মেরুদণ্ডহীন পিছিয়ে পড়া মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিপুল অংশ সেই রায়কেই মাথা মেতে নিয়ে বোতাম টেপে- ইভিএম মেশিনে ও মেশিনগানে। সরকার গঠন হয়। রাজা আসে- রানি আসে। উড়ালপুলে বাসস্টপে ল্যাম্পপোস্টে ভেসে বেড়াই উন্নয়নের ফানুশ।

 পরের নির্বাচনের আগে পর্যন্ত সেই ফানুশের বাতাস ধরে রাখার কাজ বর্তায় সরকার পক্ষের কিছু বাছাই করা নেতার উপর। ফানুশ ভ্যানিস করার দায়িত্ব নেয় বিরোধীদের মোল্লা নেতারা। সে অন্য কথা। সবমিলিয়ে ভোক্তার মতিগতি বুঝে বিপননে সফল হয় এক পক্ষ। সেম থিওরি লাগু হয় আবার। মেকি উন্নয়নের এই দুষ্ট চক্র চলছে সেই স্বাধীনতার পর থেকেই। গনতন্ত্রের নামে এই প্রহসনে ক্ষতি শুধু মুসলিমদের হয় না- হয় সমগ্র রাজ্যবাসির। ভাগ হয়ে যায় জনগণ। ব্যাহত হয় দেশ ও দশের উন্নয়নের চাকা। সংশয়য়ের বাতাবরণে শান্তি বিঘ্নিন্ত হয়। পাঁচ বছর পর্যায়কালের এই দুষ্ট চক্র থেকে বের হবার সহজ রাস্তা কিন্তু উৎসমুখে রুদ্ধ।
        সাচার কমিটি, মিশ্র কমিটি, রিপোর্ট্‌, সমীক্ষা এসব উদ্দেশ্য প্রণোদিত প্রোপাগান্ডা মাত্র। এসব সংখ্যা নিয়ে নিছক ধাপ্পাবাজির খেলা। পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানেরা কখনও আলাদা ভাবে পিছিয়ে ছিল না। 
সদ্যজাত একটা স্বাধীন দেশের নাগরিকদের সাথে সুষমভাবেই বিন্যাস্ত ছিল। দেশভাগের পরে মুসলিমদের ক্রিম লেয়ারটা চলে যায় অপার বাংলায়। পড়ে থাকে দিনমজুর কৃষক গোছের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। শুনেছি আমার দাদু করিম বক্স রায়বাড়ির নারকেল গাছের তদারকি করতেন। চরম সাম্প্রদায়িক আবহাওয়াতেও তারা এপার বাংলায় তুলনামুলক নিরাপদ ছিলেন। কারন ভিলেজ অর্থনীতিতে তারা অপরিহার্য। এভাবেই থেকে যান ঠাকুর বাড়ির রহিম দর্জি, চক্কতিদের কেরামত আলিরা। তারা শ্লথগতিতে একটু একটু করে সমাজের মূল স্রোতে মিশে যাচ্ছিল। হ্যাঁ, এই গতিটা আর একটু ত্বরান্বিত করা যেতো। এর জন্য দায়ি কে? সরকার তো নিমিত্ত মাত্র। আসল দায় মুসলিম মোল্লা মউলুবি ইমামরা। গরিবের আঙিনায় ধর্ম নিয়ে ব্যাবসা করাটা সোজা। 

ঘোলা জলে মাছ ধরতে এগিয়ে এলেন সরকার, বিরোধী সব্বাই।একমাত্র সম্বল ছিল ভাষা। ‘বাংলা অক্ষর’ দিয়ে বাঙালিজাতির মেরুদণ্ড সোজা করা যেত। ধর্ম পরিচয় ছাপিয়ে বাঙালি কৃষ্টি একদিন মাথা তুলে দাঁড়ানোর প্রবল সম্ভবনা ছিল। সেখানেও কুঠার বসাল উর্দু – তাও আবার সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায়।নতুন মোড়কে তৈরি হল ধর্মীয় বিভাজন- বাঙ্গালী ও মুসলিম। বাংলা ভাষা বাঁচাতে বুকের রক্ত উপুড় করে ঢেলে দিয়েছিল যে সালাম বরকত রফিক জব্বার সফিরা – তারা আর কেউ বাঙ্গালী রইল না। নতুন পরিভাষায় তারা শুধুই মুসলিম।
না ঘরকা না ঘাটকা। না আধ্যাত্বিক দর্শনে না সামাজিক মননে। স্বাভাবিকভাবেই তারা প্রগতিশীল সামাজিক পরিষেবা ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে।কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকীর্ণ হয়ে গেল। 
তবুও নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত শাক দিয়ে মাছ ঢাকা গেছিল। এরপর খোলা অর্থনীতিতে শ্রমবিভাজন স্পষ্ট হল। চাচারা বুঝলেন, শুধু পরকাল নিয়ে পড়ে থাকলে হবে না। ক্রয় ক্ষমতায় ভারসাম্য হারিয়েছেন। ইহকাল পরকাল দুইই টালমাটাল। অতএব ‘জবাব চাই’ স্লোগান শুরু করলেন। বহুদলীয় রাজনিতিতে এ এক মোক্ষম সুযোগ। ‘জবাব’ দেবার লোকও পেয়ে গেলেন। মাদ্রাসার আধুনিকরন করে থুতু দিয়ে চিড়ে ভেজানোর চেষ্টা হল। ইমাম ভাতা চালু হল। ওবিসি লিস্টিতে ঠাই হল। ইফতার খেতে পেলেন পেট পুরে। উর্দু ভাষায় ছাপা হল সরকারী বিজ্ঞাপনে। আর রেশনে ২ কেজি বাড়তি চাল। স্পষ্টভাবে শুরু হল ধর্মভিত্তিক তোষামোদি ও বিরুদ্ধাচারন সমান্তরালে। কেল্লা ফতেহ।
 প্রতিক্রিয়াশীলরা এটাই চান। ‘মানুষ’ করে বাঁচিয়ে রাখার থেকে ‘হিন্দু’ করে , ‘মুসলিম’ করে বাঁচিয়ে রাখতে পারলে তারা অনেক নিরাপদ। নিরাপত্তার বেড়ি আরও শক্ত করতে ভাষার বন্ধনটাও ভেঙ্গে দেওয়া হল- ‘বাঙ্গালী’ ও ‘মুসলিম’ পরিচয়ে।
 উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রতিভাবান ভাষাগোষ্ঠীর প্রগতিশীল সমাজ সংস্কৃতিকে জীবন্ত কবর দেওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত। অতঃপর…… ক্রমশঃ 

No comments:

Post a Comment